Spread the love

“বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের মধ্যে গর্ভপাতের প্রবণতা ও কারণসমূহ” শীর্ষক গবেষণাটি সম্প্রতি বিশ্বের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংগার ন্যাচার’-প্রকাশিত ‘প্রজনন স্বাস্থ্য’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনিরাপদ গর্ভপাতের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী সক্ষমতা হারায় ও মৃত্যুবরণ করে। ২০১০-২০১৪ সালের মধ্যে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন নারী গর্ভপাতজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে যার ৮৮ শতাংশই ঘটেছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। গর্ভপাত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ার কারণে বাংলাদেশেও অনিরাপদ গর্ভপাত ও এ জনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি।

বাংলাদেশের গর্ভপাত-সংক্রান্ত অধিকাংশ আইন মূলত ব্রিটিশ আমলের ১৮৬০ সালের পেনাল কোড থেকে আসা, যা অনুসারে গর্ভপাত নিষিদ্ধ, যদি না নারীর জীবন বাঁচাতে গর্ভপাতের প্রয়োজন হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কালীন সময়ে গর্ভপাতের আইনের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়। যেমন ১৯৭২ সালের আইন অনুসারে যেসব নারী মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাদের জন্য গর্ভপাত বৈধ করা হয়েছিলো। এছাড়াও ১৯৭৯ সালে ঋতুস্রাব নিয়মিতকরণ বা মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশনের ( এমআর) অধীনে , অর্থাৎ, নারীদের ঋতুস্রাব নিয়মিত করার জন্য গর্ভপাত বৈধ করা হয়। মূলত বাংলাদেশে এই পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে বৈধভাবে (আইনগতভাবে) গর্ভপাত করানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কিছু ব্যতিক্রমবাদে পেনাল কোডের মূল আইন অনুসারে বাংলাদেশে গর্ভপাত নিষিদ্ধ।

এমতাবস্থায়, নারীদের অনিরাপদ গর্ভপাতের আশ্রয় নিতে হয় যার ফলে মাতৃমৃত্যুহারে বেড়ে যাচ্ছে। যেমন, ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালে গর্ভপাতজনিত মৃত্যুহার বেড়েছে ১ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ। মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের মধ্যে গর্ভপাতের প্রবণতা ও কারণসমূহ সনাক্ত জরুরি। এ প্রেক্ষিতে, বিডিএইচস ২০১৪-এর জরিপকৃত তথ্যের ভিত্তিতে  ১৫-৪৯ বয়সী  ৮০৮৪ জন্ নারীদের মধ্যে এই গবেষণা করা হয়।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ১২.৩ শতাংশ নারী ঋতুস্রাব নিয়মিতকরণ মাধ্যমে গর্ভপাত করেছে। গর্ভপাত করার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলোঃ বসবাসের ভৌগলিক অঞ্চল , আর্থ-সামাজিক অবস্থা , কর্মসংস্থান, সন্তান সংখ্যা, এবং বিভিন্ন এনজিও সদস্যপদ।ঢাকায় বসবাসকারী নারীদের তুলনায় চট্টগ্রাম ও সিলেটে বসবাসকারীদের মধ্যে গর্ভপাত পরিষেবা গ্রহণের প্রবণতা যথাক্রমে ২৬ ও ৫৩ শতাংশ কম। মধ্যবিত্ত পরিবারের তুলনায় উচ্চ ও  অতি-উচ্চ আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের নারীদের মধ্যে গর্ভপাত পরিষেবা গ্রহণের প্রবণতা যথাক্রমে ৪৭ ও ৬০ শতাংশ বেশি। একইভাবে, গৃহিনী নারীদের চেয়ে কর্মজীবী নারীদের মধ্যে গর্ভপাত পরিষেবা গ্রহণের প্রবণতা ৩৫ শতাংশ বেশি। এনজিও সদস্যপদ ও উল্লেখযোগ্য যেমন-যেসব নারীদের কোন এনজিও-তে সদস্যপদ নেই তাঁদের তুলনায় যেসব নারী কোন না কোন এনজিও-এর সদস্য, সেসব নারীদের মধ্যে গর্ভপাত পরিষেবা গ্রহণের প্রবণতা ১৮ শতাংশ বেশি।

আঞ্চলিক অসমতা বা ঢাকা বিভাগে বসবাসকারী নারীদের মধ্যে গর্ভপাত পরিষেবা গ্রহণের প্রবণতা অধিক হওয়ার কারণ প্রজনন স্বাস্থ্য ও গর্ভপাত বিষয়ে অধিক সচেতনতা, সরকারী-বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও এনজিওর সুবিধা। পৌরসভা এবং গ্রামীণ অঞ্চল গুলোতে  ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং এনজিওগুলো গর্ভপাত পরিষেবা অপ্রতুল। এছাড়াও রক্ষণশীল সামাজিক বা ধর্মীয় মতবাদ, প্রচলিত স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভুল বিশ্বাস, গর্ভপাত পরিষেবা গ্রহণে অনীহা, সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব, পর্যাপ্ত স্টাফ বা সরঞ্জাম অভাব ও স্থান সংকট অন্যতম। যার ফলে অনিরাপদ গর্ভপাত করে ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে।

উচ্চ ও অতি-উচ্চ আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পন্ন নারীরা নিজেদের গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে এবং ভালো মানের বেসরকারি হাসপাতাল থেকে গর্ভপাত পরিষেবা গ্রহণ করতে পারে যা নিম্ন ও মধ্যম আর্থ-সামাজিক অবস্থা নারীদের জন্য সম্ভব নয়। একইভাবে, কর্মজীবী নারীরা নিজেদের সক্ষমতার কারণে এই পরিষেবা খুব সহজেই গ্রহণ করতে পারে যা সাধারণ গৃহিনী নারীদের দ্বারা অসম্ভব।

অন্যদিকে এনজিওগুলো নারীদের মধ্যে স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বাড়ায়, ক্ষমতায়ন করে এবং কিছু কিছু এনজিও গর্ভপাত পরিষেবা প্রদান করে যা এনজিও-এর সদস্য নারীদের মধ্যে এই সেবা গ্রহণে প্রবণতা বাড়ায়।

স্বাস্থ্য নীতিমালায় প্রাধান্যস্বরূপ ভৌগলিক ও আর্থ-সামাজিক অসমতা হ্রাস করে বিশেষত পৌরসভা এবং গ্রামীণ পর্যায়ে গর্ভপাত পরিষেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাংলাদেশের গর্ভপাত আইন মূলত বৈষম্যমূলক এবং আন্তর্জাতিক সর্বজনীন মানব অধিকারের লংঘন। সর্বোপরি, বাংলাদেশে গর্ভপাত আইনগতভাবে বৈধতা দেওয়া উচিত যা মূলত  অনিরাপদ গর্ভপাতের সাথে জড়িত অসুস্থতা এবং মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস করে প্রতি বছর হাজার হাজার নারীর জীবন বাঁচাবে।

This research was led by Juwel Rana, Lecturer, Department of Public Health, North South University, Bangladesh.

Source: Rana, J., Sen, K.K., Sultana, T. et al. Prevalence and determinants of menstrual regulation among ever-married women in Bangladesh: evidence from a national survey. Reprod Health 16, 123 (2019). https://doi.org/10.1186/s12978-019-0785-7